রাশিয়ার ‘লৌহমানব’ একাই বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব ফেলেন, ৫৭ মুসলিম দেশ মিলে কেনো ব্যর্থ?
বিশ্ব রাজনীতিতে এককভাবে প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্রনেতাদের তালিকায় ভ্লাদিমির পুতিনের নাম দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে। রাশিয়ার এই প্রেসিডেন্ট তার কঠোর অবস্থান, জাতীয় স্বার্থে আপসহীনতা এবং বিশ্বশক্তির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসিকতার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে ‘লৌহমানব’ হিসেবে পরিচিত। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে তিনি শুধু কিয়েভ নয়, পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বেও নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন।
পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক সহায়তা সত্ত্বেও পুতিন তার অবস্থান থেকে পিছু হটেননি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনকে ব্যাপক অস্ত্র সহায়তা দিলেও তা রাশিয়ার অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি। অবশেষে পশ্চিমারা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
বিপরীতে মুসলিম বিশ্ব: জনসংখ্যা বিশাল, অবস্থান দুর্বল
এদিকে ৫৭টি মুসলিম দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি হলেও, ফিলিস্তিন ইস্যুর মতো মানবিক সংকটে তারা এখনো একক, দৃঢ় ও কার্যকর অবস্থান নিতে পারেনি। মাত্র এক কোটির কম জনসংখ্যার ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলো বারবার বিবৃতি দিলেও বাস্তব কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ হলো মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক বিভাজন, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং পশ্চিমা নির্ভরশীলতা। অধিকাংশ মুসলিম দেশেই গণতন্ত্র অনুপস্থিত, যেখানে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে না। বেশিরভাগ দেশেই শাসকগোষ্ঠী রাজতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অধীনে, যারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ‘সাবধানে’ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে।
লিবিয়া-সিরিয়া অভিজ্ঞতা: ভয়ের ছায়া
আরব বসন্তের সময় লিবিয়া ও সিরিয়ার মতো দেশগুলো পশ্চিমা হস্তক্ষেপে বিপর্যস্ত হয়। এ অভিজ্ঞতা অন্য মুসলিম দেশগুলোকে সতর্ক করে তুলেছে। এখন তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান না নিয়ে বরং বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ইরান-তুরস্ক: সীমিত প্রতিবাদ, ভিন্ন পন্থা
ইরান একমাত্র মুসলিম দেশ, যারা বহু বছর ধরে প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরোধিতা করে আসছে। তবে দেশটি দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক মাঝে মাঝে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কড়া বক্তব্য দিলেও, ন্যাটো সদস্য হওয়ায় এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার কারণে সে প্রতিবাদ অনেকটাই কৌশলগত।
মুসলিম বিশ্বের ব্যর্থতার কারণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুসলিম বিশ্বের দুর্বলতার চারটি বড় কারণ রয়েছে:
১/রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা২
/ সামরিক ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা
3/পশ্চিমা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
৪/ পারস্পরিক ঐক্যের অভাব ও বিভক্তি
তারা বলেন, মুসলিম দেশগুলো যদি নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াত, সামরিক সক্ষমতা উন্নত করত, এবং গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করত— তাহলে আজ ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিশ্বে একটি শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারত।
পুতিন বনাম মুসলিম বিশ্ব: একটি তুলনা
রাশিয়া: এককভাবে জর্জিয়া আক্রমণ, ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ, সাইবার যুদ্ধে প্রভাব বিস্তার, ইউক্রেন যুদ্ধ
মুসলিম বিশ্ব: যৌথভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুতেও কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থ
এই বাস্তবতা বিশ্বমঞ্চে মুসলিম দেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশ্ব রাজনীতিতে জনসংখ্যা নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস, স্বার্থে একতা এবং কৌশলগত সক্ষমতাই নেতৃত্ব নির্ধারণ করে—পুতিনের রাশিয়া যেখানে তার প্রমাণ, সেখানে মুসলিম বিশ্বের দুর্বল অবস্থান একটি দুঃখজনক বাস্তবতা।
প্রতিবেদন: বার্তাবাহক ডেস্ক
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য, পররাষ্ট্র বিষয়ক গবেষণা







